Friday, 3 February 2023

মেরিন পেশা কেমন?

 বাঙ্গালীদের অনেক অজানা বিষয়ের মধ্যে মেরিন পেশাটি ও একটি । এই পেশাটি সম্পূর্ণ জাহাজ নির্ভর হওয়ার কারণে এবং জাহাজে সর্ব সাধারণের প্রবেশের সুযোগ না থাকায় এবং একজন মেরিনার এর কর্মক্ষেত্র পুরোটাই জাহাজ নির্ভর হওয়ার কারণে এ সম্পর্কে সাধারণ জনগন সহ অনেক বড় বড় সরকারি কর্মকর্তাদের/মন্ত্রী মহোদয়দের ও ধারনা প্রায় নেই বললেই চলে।

এমন অনেক উদাহরণ ও আছে যে একজন মেরিনার এর বাবা মা ভাই বোন এমনকি স্ত্রী ও সঠিকভাবে এই পেশাটি সম্পর্কে জানে না অথবা জানলে বলতে পারে না ।
যাইহোক আমার উদ্দেশ্য আমার পারিপার্শ্বিক সবাইকে এ বিষয়ে একটা নূন্যতম ধারনা দেয়া । প্রথম বিষয় হচ্ছে মেরিন কোনো সামরিক বাহিনী না, এটি একটি কোম্পানি নির্ভর পেশা।এবং জাহাজ নিজেই একটি আলাদা কোম্পানীর মত । দ্বিতীয়ত মেরিনার মানেই ইন্জিনিয়ার না । একটা জাহাজে সাধারণত 2 টা ডিপার্টমেন্ট থাকে = ডেক (নট্যিকাল) ও ইন্জিন । ডেক ডিপার্টমেন্ট এ প্রধান চিফ অফিসার এবং ইন্জিনে চিফ ইন্জিনিয়ার । তাদের অধতন হিসাবে থাকে পর্যায়ক্রমে 2ন্ড অফিসার/2ন্ড ইন্জিনিয়ার , 3র্ড অফিসার /3র্ড ইন্জিনিয়ার, 4র্থ ইন্জিনিয়ার , ইন্জিন ক্যডেট অফিসার ও ডেক ক্যডেট অফিসার ( ক্ষেত্রবিশেষে 4র্থ অফিসার & 5ত্থ ইন্জিনিয়ার ও থাকে) । এবং পুরো জাহাজের দায়িত্বে থাকেন ক্যপ্টেন (মাষ্টার ) । সাধারণত চিফ অফিসারই প্রমোটেড হয়ে ক্যাপ্টেন হয়। সেম নেমের ইন্জিনিয়ার , সেম নেমের অফিসার থেকে সিনিয়র । কিন্তু ডিপার্টমেন্ট আলাদা হওয়ায় কর্মক্ষেত্র এবং চেইন অফ কমান্ড ভিন্ন । এছাড়াও ইন্জিনে ইলেকট্রিক ইন্জিনিয়ার বলে একজন/একাধিক ইন্জিনিয়ার থাকেন যিনি সার্টিফিকেট এবং এক্সপেরিয়েন্সের ভিত্তিতে ক্যাডেট অফিসার থেকে শুরু করে 3র্ড ইন্জিনিয়ার সমমর্যাদার হতে পারেন । ডেকের অধতনে আরেকটি ডিপার্টমেন্ট আছে, ক্যাটা্রিন্ঙ ডিপার্টমেন্ট , যেখানে এক বা একাধিক কুক ও স্টুয়ার্ড কাজ করেন । প্রতেক ডিপার্টমেন্টে 5/6 জন রেটিন্ঙস (ক্রু ) কাজ করেন । এক্সপেরিয়েন্স ও কোর্সের ভিত্তিতে তাদেরকে ও যথাক্রমে বোসান , ওয়েল্ডার , এবি , ওয়েলার, ওএস, ফায়ারম্যান সহ বিভিন্ন রা্ন্কে ভাগ করা হয় ।
ইন সর্ট ডেক পা্রসনেলের কাজ জাহাজ সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং কার্গোর সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং ইন্জিনিয়ারগন জাহাজের ইন্জিন ,জেনারেটর সহ সকল মেসিনারিজের রাউন্ড দ্যা ক্লক পর্যবেক্ষণ ও মেইন্টেন্স ।এবং জাহাজের সকলেই নূন্যতম আট ঘন্টা সপ্তাহে সাতদিন তার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালন করেন ।
এবার আসি কিভাবে এই পেশায় আসা যায় ।
১/ রেটিং হিসেবে আসতে গেলে NMI(national maritime institution ) থেকে ৬ মাসের কোর্স করে রেটিং হিসাবে জাহাজে যোগদান করা যায় । (ইলেকট্রিক ইন্জিনিয়ার ও এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই আসেন)। SSC পাশের পর এখানে ভর্তি হয়(কুক, ওয়েল্ডার ও ইলেকট্রিক ইন্জিনিয়ার এর সিস্টেম একটু ভিন্ন ) ।
২/ BMA (Bangladesh marine academy) থেকে ২ বছর রেজিমেন্টাল ট্রেনিং করে জাহাজে ক্যাডেট অফিসার হিসেবে যোগদান হয় । পরবর্তীতে ১২ মাস সী সার্ভিসের মাধ্যমে ও প্রোমোশনাল এক্সামে পাশের মাধ্যমে ৩/৪ অফিসার অথবা ৪/৫ ইন্জিনিয়ার হিসেবে প্রোমোটেড হয় । পরবর্তীতে আরো সী সার্ভিসের ও প্রোমোশনাল এক্সামে পাস করে পরবর্তী পদবীতে প্রোমোশন হয় । এই পরীক্ষা গুলো পুরোপুরি নিজের খরচে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে কোম্পানি বহন করে থাকে । BMA তে যেসব ক্যাডেট রিটেন পরীক্ষা, মেডিকেল, ফিজিকাল টেস্ট এবং ভাইভা তে টিকে তারা তাদের প্রোফেশনাল বিষয়ের সাথে BSMRMU (BONGOBONDHU SEIKH MUJIBUR RAHMAN MARITIME UNIVERSITY) এর অধীনে ৪ বছর মেয়াদি Bachelor’s of Maritime Science অনার্স সার্টিফিকেট অর্জন করেন । এখানে HSC এর পর ভর্তি নেওয়া হয় ।এবং কেউ চাইলে সুইডেন মালমো (World MARITIME UNIVERSITY ) থেকে ভর্তি পরীক্ষা সাপেক্ষে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহন করতে পারবেন ।
৩/প্রাইভেট মেরিন ইন্সটিটিউট থেকে কিছু সংখ্যক ক্যাডেট ২ বছর মেয়াদি কোর্স করে জাহাজে ক্যাডেট হিসেবে জয়েন করেন । কিন্তু তাদের কনভেনশনাল শিক্ষাগত যোগ্যতা HSC থেকে যায় ।
৪/ HSC এর পর কিছু সংখ্যক ক্যাডেট সরাসরি ক্যাডেট হিসেবে জাহাজে যোগদান করেন এবং ৩৬/৪২ মাস সী সার্ভিসের মাধ্যমে তারা প্রোমোশনাল পরীক্ষার যোগ্যতা অর্জন করেন ।
** কিছু সাধারণ তথ্য ।
১/ এটি কন্ট্রাক্ট ভিত্তীর পেশা , কেউ চার মাস , কেউ ছয়, কেউ নয় এবং সর্বোচ্চ ১২ মাস এক টানা কাজের কন্ট্রাক্ট করা হয় ।
২/ সকল জাহাজে স্যাটেলাইট ফোন থাকে , প্রায় ৩৬ মিন কথা বলা যায় ২০ ডলার খরচ করে ।
৩/ অনেক জাহাজে WiFi থাকে , আবার নাও থাকতে পারে ।
৪/ লাইফ বোট ক্যাপাসিটি ও কম্পানির অনুমতির সাপেক্ষে জাহাজে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে থাকা যায় ।
৫/ ৬ মাস চাকরি ৬ মাস নাই এমন কোনো কথা নাই , অনেকে জাহাজ থেকে নামার মাস খানেকের মধ্যেই আরেক জাহাজে উঠেছে, আবার অনেকে ২ বছর পরেও উঠেছে । পুরোপুরি আপনার যোগ্যতা , যোগাযোগ, মার্কেটর চাহিদার উপর নির্ভরশীল ।
৬/বর্তমানে সময় মানে টাকার কারনে জাহাজের পোর্ট স্টে টাইম অনেক কমে গিয়েছে , ফলে জাহাজীরা ৬ /৭ মাসের কন্ট্যাক্টে সাধারণত বড়জোর ৩/৪ দিন পোর্ট সিটি ভিজিট অথবা সোর পান ।
৭/ বেশীরভাগ জাহাজে ০ এলকোহল পলেসী থাকে ।
৮/ জাহাজে কোন আন-অথরাইজড এন্ট্রি নাই ।
৯/ নেভী থেকে শর্তপূরণ সাপেক্ষে এবং ফিসারিজ একাডেমীর শিক্ষার্থীরা শর্ত সাপেক্ষে এই পেশায় ঢুকতে পারে ।
১০/ সকল মেরিন ডিপ্লোমাধারীরা এবং বুয়েটের NAME এর শিক্ষার্থীরা জাহাজ তৈরি অথবা রিপেয়ার এর কাজে ড্রাইডকে কাজ করেন । তারা মেরিনার পেশার অন্তর্ভুক্ত নয় । কিন্তু আনুসাঙ্গিক কোর্সের সাপেক্ষে সিডিসি প্রাপ্ত হলে তারাও জাহাজে যোগদান করতে পারে ।
১১/ আপনি চাইলে যে কোন সময় এই পেশা থেকে রিটায়ার করতে পারবেন ।
১২/ সাধারণত চীফ ইন্জিনিয়ার অথবা ক্যাপ্টেন ব্যতীত কোন রিটায়ার্ড মেরিনারই সোর জব এ convenient ফ্যাসিলিটিজ পায় না ।
১৩/বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি ( বি.আই.এম.টি) তে এস এস সি এর পর চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন মেরিন ইনজিনিয়ারিং পড়ে সাধারনত শিক্ষার্থী রা পাওয়ার প্লান্টে সাব এসিস্টেন্ট/ এসিস্টেন্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকুরী বা উচ্চ শিক্ষা বা বিদেশী শীপ ইয়ার্ড বা প্লান্ট চাকুরী মুখীই বেশী। খুব কমই শিপিং প্রফেশন এ আসে। তবে পূর্বে সরাসরি সিডিসি প্রাপ্তির সুযোগ থাকলেও এখন নৌপরিবহন অধিদপ্তরে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার অফিসার ক্লাস-৫ পরীক্ষায় পাশের মাধ্যমে এই পেশায় আসার সুযোগ খোলা আছে। ডি.এম.ই করা একজন ক্যাডেট কে কোস্টাল সি টাইম ১২ মাস ( ৬ মাস জব ট্রেইনিং+ ৬ মাস অতিরিক্ত), এম,ই,ও-৪/৫ প্রিপারেটরী কোর্স, ৬ টি বেসিক কোর্স সিওপি লাগে। আর অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিটাকের ওয়ার্কশপ কোর্স লাগবে। সিওসি-৫ এর পর ডিজি শিপিং এর নির্ধারিত কিছু শর্ত সাপেক্ষে সিডিসি এর এনওসি পাওয়া যায়। এবং ২৪-৩০ মাস মার্চেন্ট শিপিং/ নিয়ার কোস্টাল ভয়েজ জাহাজে সি সার্ভিস দ্বারা ক্লাস-৩ পরীক্ষা দিতে হয়।
আশা করি সবাই কিছুটা হলেও আমার এই পোস্ট থেকে জানতে পারবেন অথবা ধারনা ঠিক করতে পারবেন । এবং কেউ অগ্যতার সুযোগ নিয়ে ঠকাতে পারবে না । এবং বান্ঙালীর স্বভাব ই হচ্ছে যে কোন উন্নয়নশীল স্থানে অনিয়ম করে ফায়দা লুটা । সেই ধারা বজায় রেখে এই পেশার মিথ্যা নামধারী মানুষ আপনার অগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে অথবা আপনার অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে আপনাকে ঠকাতে পারে।তাই সবাই নিজের সেফটির জন্য হলেও এই বিষয়ে জানি এবং সঠিক ইনফরমেশন কাছে রাখি । কারো পোশাকি হাব ভাবে বিশ্বাস না করি অথবা মিথ্যা ভেকধারীদেরকে দেখে ভুল ধারণা রেখে সঠিক এবং সম্মানিত কাউকে বিচার না করি ।

No comments:

Post a Comment